২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, ঠিক সেই সময় আন্দোলনের অন্যতম রূপকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
তার মতে, পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা ‘ওল্ড গার্ড’-এর পুনর্গঠনের ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শ আজ গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে ২৭ বছর বয়সী এই ছাত্রনেতা তার অন্তর্বর্তী সরকার থেকে পদত্যাগ, নির্বাচনে অংশ না নেওয়া এবং কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।
এনসিপি-জামায়াত জোট নিয়ে আপত্তি
সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আলম জানান, তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)-তে যোগ দেবেন—এমন প্রত্যাশা রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকলেও এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে গঠিত নির্বাচনী জোটের কারণেই তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
তার অভিযোগ, এই জোট গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ এবং অনেক ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরীণ নেতাদের সঙ্গেও যথাযথ আলোচনা করা হয়নি। তিনি বলেন, “এক সন্ধ্যায় এনসিপির অনেক নেতাও জানতেন না যে এমন একটি জোট হতে যাচ্ছে।”
মাহফুজ আলমের মতে, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলে পুরনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে জোট করা আত্মবিরোধী। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “আপনি পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার রক্ষকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন রাজনীতির দাবি করতে পারেন না।”
আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ‘অল্টার ইগো’
সাক্ষাৎকারে তিনি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামিকে একে অপরের ‘অল্টার ইগো’ বা পরিপূরক শক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাষায়, “আওয়ামী লীগ থাকলে জামায়াত থাকবে, আর জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগ থাকবে। এই দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে আসাই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা।”
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের রাজনীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, জননীতি, শ্রেণি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বাস্তবতা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ভিশনের অভাব রয়েছে। ফলে তাদের সঙ্গে জোট করলে অনেক মৌলিক প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব হয় না।
‘তৃতীয় বিকল্প’ ব্যর্থ হওয়ায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত
মাহফুজ আলম জানান, তার লক্ষ্য ছিল জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব তরুণ শক্তিকে একত্রিত করে একটি সাধারণ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা এবং জনগণের সামনে একটি ‘তৃতীয় বিকল্প’ হাজির করা—বিএনপি-জামায়াত বনাম নতুন রাজনৈতিক শক্তি।
তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং আদর্শিক মিল না থাকায় তিনি আপাতত নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মাহফুজ আলম বলেন, তিনি আপাতত রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকেই কাজ করতে চান। জুলাইয়ের আগের জীবনে ফিরে গিয়ে বই পড়া, চিন্তাচর্চা করা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই এখন তার মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, হতাশ তরুণদের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন—কেন জুলাই আন্দোলন প্রত্যাশামতো সফল হলো না, কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
সাংস্কৃতিক পুনঃসমঝোতার ওপর জোর
সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রসঙ্গে মাহফুজ আলম বলেন, বাংলাদেশে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। সমাজের ভেতরে যে ফ্যাসিবাদী মানসিকতা ও তার প্রতিক্রিয়ায় আরেক ধরনের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই প্রয়োজন।
তার মতে, সমাজে জমে থাকা দমন, ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে। এসব বিষয়কে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত না করতে পারলে ভবিষ্যতে মব ভায়োলেন্স ও সামাজিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচনের পরও সংগ্রাম চলবে
নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলেও তরুণদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ, মধ্যবিত্ত এবং গণমাধ্যমসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে একটি বৃহত্তর সামাজিক পুনঃসমঝোতা ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তার ভাষায়, “মানুষ এখন গণমাধ্যমকেও বিশ্বাস করে না। এই আস্থার সংকট দূর না হলে কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।”
মাহফুজ আলমের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে বাংলাদেশ বারবার একই সংকটে ফিরে যাবে।

















